Main Menu

ইজতেমা বিভক্ত কেন উপলব্ধি করতে হবে

 

বিশ্বের প্রায় মুসলিমই দাওয়াতে তাবলিগের মেহনতের সঙ্গে পরিচিত। দাওয়াত অর্থ আহ্বান, তাবলিগ অর্থ পৌঁছানো। ইসলামের মহান আদর্শে নিজে পরিচালিত হয়ে অপরকেও ডাকা তাবলিগ জামাতের মূল কার্যক্রম। আল্লাহতায়ালা বলেন, তোমরা ডাক তোমাদের রবের পথে হেকমত (প্রজ্ঞা ও কৌশল) এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে। (সূরা নাহল-আয়াত ১২৫।)

ইসলামের সহজ-সরল ও যৌক্তিক বিধানগুলো মানুষের দোয়ারে পৌঁছে দেয়াই তাবলিগ। যুগে যুগে মহান মনীষীরা এ দায়িত্ব পালন করেছেন; কিন্তু বিগত শতাব্দীতে তাবলিগ জামাতের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী এ কাজ বিস্তৃতি পেয়েছে। তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মিলন বিশ্ব ইজতেমার মহান নিয়ামত আমরা বাংলাদেশে পেয়েছি। বিগত ৫৪ বছর ধরে অত্যন্ত সুনাম ও গর্বের সঙ্গে আমরা বিশ্ব ইজতেমা করছি টঙ্গীর তুরাগতীরে। সারা বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছিল এ তুরাগতীর। কিন্তু এবারের ইজতেমা নিয়ে শুরু থেকেই নানা শঙ্কা ছিল। সব শঙ্কা ও হতাশার কালো মেঘ সরিয়ে অবশেষে ইজতেমা হল। এটাই আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি।

তাবলিগ জামাতের সাম্প্রতিক বিভাজনে বাংলাদেশের আপামর জনতা সবাই ব্যথিত। বিশ্ব ইজতেমা সুন্দরভাবে হোক, দেশের প্রতিটি নাগরিকেই এ প্রত্যাশা ছিল। আল্লাহ সবার চাওয়াকে পূর্ণ করে আমাদের সুন্দরভাবে ইজতেমা করার তাওফিক দিয়েছেন। শোকর আলহামদুল্লিাহ। টানা চার দিন দু’পক্ষের আলাদাভাবে ইজতেমা হওয়ার কথা থাকলেও তাবলিগের ইতিহাসে ব্যতিক্রম এবারের ইজতেমা ছয় দিনে শেষ হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি থেকেই ময়দানে আসতে শুরু করেছেন মুসল্লিরা। ১৩ ফেব্রুয়ারি মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। সাধারণ সাথীদের পাশাপাশি মাদ্রাসা ছাত্রদের উৎসাহ ছিল ব্যাপক। দেশের প্রায় সবক’টি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরাই ইজতেমায় শরিক হতে ছুটে আসেন তুরাগতীরে।

১৪ ফেব্রুয়ারি বাদ ফজর কাকরাইলের মাওলানা আবদুল মতিনের বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার কার্যক্রম। ততক্ষণে মাঠে তিল ধারণের জায়গা নেই। এ দিন বিকালে ভারত-পাকিস্তান থেকে তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বিরা এসে পৌঁছান ইজতেমা ময়দানে। তাবলিগ জামাত আন্তর্জাতিকভাবে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় মাওলানা সা’দ কান্ধলভীবিরোধীরা অংশ নেন প্রথম পর্বে। নিজামুদ্দীন মার্কাজের সাবেক মুরব্বি মাওলানা আহমদ লাট ও মাওলানা ইবরাহিম দেওলা কয়েক বছর পর টঙ্গী ইজতেমায় এসেছেন। তাই তাদের অনুসারীদের মধ্যে ছিল উৎসবের আমেজ। শুক্রবার ইজতেমা ময়দানের জুমার নামাজে শরিক হতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে এসেছেন মুসল্লিরা।

তাবলিগের বিভাজন সাধারণ মুসল্লিরা বোঝেন না, জানতেও পছন্দ করেন না। তাদের কাছে টঙ্গী ময়দান হল তীর্থস্থান। এখানে জুমা ও দোয়ায় শরিক হতে ছুটে আসেন তারা। তাবলিগ জামাতের প্রতি সাধারণ মানুষের এ আবেগ, ভালোবাসা এখনও রয়েছে। তাই যত দ্রুত বিবাদ ছুড়ে তারা নেক মানসিকতায় এক হতে পারবেন, ততই মঙ্গল। শনিবারের দোয়াতেও মানুষ আগ্রহভরে শরিক হয়েছেন। ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই ছুটে গিয়েছেন তুরাগতীরে। তবে এবারের ইজতেমা যেহেতু অন্য বছর চেয়ে ব্যতিক্রম, তাই উৎসবের আমেজে ভাটা পড়াটাই স্বাভাবিক। ১৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরের আগেই দোয়া শেষ করে ময়দান ছাড়তে শুরু করেন মাওলানা জুবায়ের ও তার অনুসারীরা।

রোববার সকাল থেকে শুরু হয় মাওলানা সা’দ অনুসারীদের ইজতেমা। ময়দানে প্রবেশ করেই তাদের পড়তে হয় দুর্ভোগে। শিলাবৃষ্টির কারণে ময়দানের বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে যায়। রোববার রাতে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে দোয়া একদিন পিছিয়ে মঙ্গলবার আনা হয়। প্রথম পর্বের চেয়ে দ্বিতীয় পর্বে জনসমাগম কিছুটা কমই ছিল। কর্মদিবস ও সপ্তাহের মাঝে হওয়ায় সাধারণ মুসল্লিদের আসার সুযোগ তেমন ছিল না। তবে ইজতেমার দু’পর্বেই বিদেশি মেহমানদের অবস্থা ছিল হতাশাজনক। বিশ্ব ইজতেমায় বিগত বছরগুলোতে বিদেশিদের যে ভিড় ছিল, তার সিকিভাগও এবার ছিল না। বাংলাদেশে তাবলিগ জামাত দু’ভাগ হয়ে যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়েছে, তাই নিরাপত্তার কথা ভেবেই অনেক বিদেশি মুসল্লি অংশ নেননি। প্রতি বছরের ইজতেমায় তাবলিগের আন্তর্জাতিক শূরা সদস্যরা উপস্থিত থাকতেন। এবার দু-একটি দেশ ছাড়া কোনো দেশের শূরারাই আসেননি।

নানা অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলেও বিভক্ত এ ইজতেমা আমাদের অনেক কিছুই শিখিয়েছে। এভাবে নিজেদের মধ্যে মোরগ লড়াই অব্যাহত রাখলে সামনে এটি আর বিশ্ব ইজতেমা থাকবে না, হয়ে যাবে দেশীয় বা আঞ্চলিক ইজতেমা। আল্লাহতায়ালা দয়া করে আমাদের দেশে ইজতেমার যে নেয়ামত দিয়েছেন, আমাদের জেদাজেদির কারণে তা হারাতে হলে দুর্ভাগা আমরাই হব।

এবারের ইজতেমায় দু’পক্ষ আলাদাভাবে দোয়া পরিচালনা করেছেন। সবার দোয়ার ভাবভঙ্গি এক ও অভিন্ন। পরম করুণাময়ের কাছে কায়মনোবাক্যে সাহায্য ও আশ্রয় চেয়েছে উভয় পক্ষই। যে আল্লাহর কাছে আলাদাভাবে সাহায্য চাওয়া হয়েছে, সেই আল্লাহ কোরআনে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন- তোমরা আল্লাহতায়ালা ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো, নিজেদের মধ্যে পরস্পর ঝগড়া-বিবাদ করো না, অন্যথায় তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তি শেষ হয়ে যাবে, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; অবশ্যই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে রয়েছেন। (সূরা আনফাল-আয়াত ৪৬)।

নিজেদের মধ্যে লড়াই করে তাবলিগ জামাতের প্রভাব প্রতিপত্তি বেড়েছে বা কমেছে তা তাবলিগি মুরব্বিদের এবারের ইজতেমা থেকেই উপলব্ধি করতে হবে। বিশ্ব ইজতেমার আখেরি মোনাজাত আগে জাতীয় উৎসবে পরিণত হতো। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ সবাই দোয়ায় শরিক হতেন। এবারের আখেরি মোনাজাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কেউ শরিক হননি। সাধারণ মানুষও তেমন আগ্রহ দেখায়নি। এসব যে পরস্পরের দ্বন্দ্বের ফসল, তা এখনই উপলব্ধি করতে হবে। এমন বিভক্ত ইজতেমায় আখেরে কোনো পক্ষেরই লাভ হয়নি। এ বাস্তবতা তাবলিগি মুরব্বিরা যত তাড়াতাড়ি বুঝতে পারবেন, ততই মঙ্গল।

লেখক : প্রাবন্ধিক






Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked as *

*